গাইবান্ধা প্রতিনিধি :
তিস্তা নদীর বুকে নির্মিত দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘হরিপুর-চিলমারী তিস্তা সেতু’ এখন শুধু একটি অবকাঠামো নয়, এটি একজন মানুষ, এক সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারক শরিতুল্যাহ মাস্টারের ত্রিশ বছরের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার অসামান্য ভূমিকার স্বীকৃতি চেয়ে ‘শরিতুল্যাহ মাস্টার তিস্তা সেতু’ নামকরণের দাবিতে গাইবান্ধাবাসী আজ রাজপথে।
রোববার (২০ জুলাই) দুপুরে গাইবান্ধা জেলা শহরের ডিবি রোডে গাইবান্ধা নাট্য ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (গানাসাস) সামনে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি। এতে অংশ নেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
এই সেতুর স্বপ্নদ্রষ্টা শরিতুল্যাহ মাস্টার ১৯৯৫ সাল থেকে এককভাবে আন্দোলন শুরু করেন। তখন তার এই স্বপ্ন অনেকের কাছে অবাস্তব বলে মনে হলেও, তিনি ছিলেন অবিচল। সময়ের পরিক্রমায় তিস্তা সেতু বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করে মানুষের মাঝে সেতুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন এবং সরকারের ওপর লাগাতার চাপ সৃষ্টি করেন। অবশেষে তার অক্লান্ত পরিশ্রম ও নেতৃত্বে ২০২৫ সালে এসে এই সেতুর স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “এই সেতু শুধু লোহার-বালুর নির্মাণ নয়, এটি শরিতুল্যাহ মাস্টারের ত্যাগ ও দূরদর্শিতার স্মারক। ৩০ বছরের অবিচল সংগ্রামের ফল এই সেতু।”
আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক শামীম মন্ডল বলেন, “তিস্তার দুই তীরে বসবাসকারী লাখো মানুষের কণ্ঠস্বর শরিতুল্যাহ মাস্টার। আজ সেই মানুষটির সম্মানেই আমরা এই দাবিতে ঐক্যবদ্ধ।”
কমিটির সদস্য সচিব শাহীন মিয়া বলেন, “এই সেতুর নাম শরিতুল্যাহ মাস্টারের নামে না হলে তা ইতিহাসের প্রতি অন্যায় হবে।”
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন স্কুল শিক্ষক শরিফুল ইসলাম, ব্যবসায়ী জিল্লু হাকিম ও ডা. ফুয়াদ ইসলাম। কলেজ শিক্ষক আনোয়ার জাহিদ বলেন, “শরিতুল্যাহ মাস্টার শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা নন, তিনি এলাকার উন্নয়ন দর্শনের রূপকার। এই সেতুর গল্প মানেই তার জীবনসংগ্রামের গল্প।”
মানববন্ধন শেষে একটি প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বরাবর স্মারকলিপি জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করে।
হরিপুর-চিলমারী তিস্তা সেতুটি এলজিইডির আওতাধীন দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। ১,৪৯০ মিটার দীর্ঘ এই সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯২৫ কোটি টাকা। এটি নির্মাণ করেছে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন। আগামী ২ আগস্ট সেতুটি উদ্বোধনের সম্ভাব্য দিন ধার্য রয়েছে। সেতুটি চালু হলে কুড়িগ্রাম-ঢাকা দূরত্ব কমবে ১৩৫ কিলোমিটার, সময় সাশ্রয় হবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।
মানুষের দাবি স্পষ্ট—এটি কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি ইতিহাসের অংশ। গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের জনমানুষ বিশ্বাস করে, সেতুটির নাম ‘শরিতুল্যাহ মাস্টার তিস্তা সেতু’ হলে সেটি হয়ে উঠবে আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণার বাতিঘর।
“একজন মানুষের স্বপ্ন দেখে অনেকেই হাসে। কিন্তু সেই মানুষই যখন ইতিহাস গড়ে, তখন জাতি তাকে শ্রদ্ধা না জানিয়ে থাকতে পারে না।” —মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারী এক শিক্ষার্থীর কণ্ঠে এমনই আবেগ ছিল স্পষ্ট।








