Home দেশ সংবাদ ড্রোন–মিসাইল প্রযুক্তিতে আলোচনায় জলঢাকার কিশোর

ড্রোন–মিসাইল প্রযুক্তিতে আলোচনায় জলঢাকার কিশোর

17
0
blank

নীলফামারী প্রতিনিধি:

অদম্য মেধা, প্রযুক্তির প্রতি গভীর অনুরাগ আর সীমাহীন কৌতূহল—এই তিনের সম্মিলিত শক্তিতে ড্রোন, রকেট ও মিসাইল প্রযুক্তিতে বিস্ময়কর সাফল্যের পথে এগিয়ে চলেছে নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার এক কিশোর। ব্র্যাক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী দেব স্বারতী তীর্থ ইতোমধ্যে নিজস্ব উদ্ভাবনী দক্ষতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে অর্থসংকট তার গবেষণা ও দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্নকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।

করোনাকালীন ঘরবন্দী সময়কে সৃজনশীলতায় রূপ দিতে গিয়ে প্রোগ্রামিং শেখার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল তীর্থের। সেই যাত্রা আজ পৌঁছেছে সামরিক ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির জটিল ও উচ্চস্তরের গবেষণায়। বয়সে কিশোর হলেও তার চিন্তা, নকশা ও প্রয়োগে রয়েছে ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।

তীর্থ উদ্ভাবিত ‘মাল্টি-ফাংশনাল ড্রোন’ কেবল একটি প্রযুক্তি প্রকল্প নয়; এটি আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্র ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য উপযোগী এক মিলিটারি-গ্রেড সিস্টেম। এতে সংযুক্ত রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, অবজেক্ট ট্র্যাকিং, স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন এবং রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ সক্ষমতা। উন্নত সেন্সরের মাধ্যমে ড্রোনটি নির্দিষ্ট এলাকা স্ক্যান করে পরিস্থিতি অনুযায়ী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে—যা উদ্ধার অভিযান, সীমান্ত নজরদারি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

ড্রোন প্রযুক্তির গণ্ডি পেরিয়ে তীর্থ বর্তমানে কাজ করছে অত্যাধুনিক রকেট ও মিসাইল সিস্টেম ডিজাইন নিয়ে। তার তৈরি মিসাইল নকশায় যুক্ত রয়েছে লো-রাডার সিগনেচার ডিজাইন, এভেসিভ ম্যানুভারিং টেকনিক ও আধুনিক গাইডেন্স কনসেপ্ট—যা শত্রুপক্ষের রাডার শনাক্তকরণ ও পাল্টা আক্রমণ এড়িয়ে চলতে সহায়ক। একজন স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীর হাতে এমন উচ্চমাত্রার প্রতিরক্ষা ধারণা ও প্রয়োগ দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার জন্য আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত বহন করে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা তুলে ধরার সুযোগ তীর্থের সামনে নতুন নয়। এর আগে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেলেও বিমানভাড়া ও আনুষঙ্গিক ব্যয় জোগাড় করতে না পারায় সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক রকেট ও মিসাইল গবেষণা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ পেলেও একই আর্থিক সংকটে তার যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তীর্থের বাবা তাপস কুমার দাস ও মা সঞ্চীতা সাহা বলেন, “সন্তানের মেধা ও স্বপ্ন আছে, কিন্তু আমাদের সামর্থ্য সীমিত। রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সহায়তা পেলে সে দেশের জন্য অনেক বড় অবদান রাখতে পারত।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় তীর্থ থেমে নেই। সে ইতোমধ্যে সাবমেরিন প্রযুক্তি ও পানির নিচে কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণার রূপরেখা প্রস্তুত করেছে—যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য যুগান্তকারী হতে পারে।

জলঢাকা ব্র্যাক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিন্দ্র নাথ রায় বলেন, “তীর্থ আমাদের গর্ব। একজন কিশোরের হাতে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে—এটি অত্যন্ত বিরল। কিন্তু উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া এমন মেধা ধরে রাখা কঠিন।”

নীলফামারীর এই ক্ষুদে বিজ্ঞানীর স্বপ্ন ও গবেষণাকে বাস্তব রূপ দিতে এখনই সময় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা ও সমাজের বিত্তবানদের সহায়তা নিশ্চিত করার। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে দেব স্বারতী তীর্থ কেবল নিজের স্বপ্নই নয়—বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকেও আন্তর্জাতিক মানচিত্রে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।