Home বাংলাদেশ চিকিৎসকের ‘ভুলে’ পেটে কাপড়, সংকটাপন্ন প্রসূতি

চিকিৎসকের ‘ভুলে’ পেটে কাপড়, সংকটাপন্ন প্রসূতি

141
0
blank

নরসিংদী প্রতিনিধ :

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আবারও অমানবিকতার করাল ছায়া। নরসিংদীতে সিজারের সময় এক প্রসূতির পেটে রক্ত মোছার কাপড় রেখে সেলাই করেন চিকিৎসক! ঘটনা জানাজানি হতেই ঢাকার এক হাসপাতালে আবার অস্ত্রোপচারে বের হয় ১৮ ইঞ্চি লম্বা ‘মব কাপড়’। আর এদিকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ওই প্রসূতি লিমা আক্তার, বুকের দুধ বঞ্চিত তার সদ্যজাত সন্তান।

ভুক্তভোগী লিমা আক্তার (২৮) নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দত্তেরগাঁও মির্জাকান্দি গ্রামের বাসিন্দা। ১৭ জুন বিকেলে নরসিংদী পৌর এলাকার বাসাইলের নরসিংদী সিটি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। সিজার করেন হাসপাতালের চিকিৎসক শিউলি আক্তার। এক পুত্রসন্তান জন্ম নেন লিমা। চারদিন পর ছাড়পত্র দেওয়া হলেও শুরু হয় ভয়ংকর এক চিকিৎসাজনিত ট্রাজেডি।

বাড়ি ফেরার পর থেকেই তীব্র পেটব্যথা, ফুলে ওঠা ও দুর্গন্ধে কাতরাতে থাকেন লিমা। ২৫ জুন আবারও নেওয়া হয় একই হাসপাতালে, কিন্তু সেখানে কোনো সমস্যা ধরা পড়ে না! পরে নরসিংদীর অন্য একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসক পেটে কিছু আছে বলে সন্দেহ করেন। দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে পাঠানোর পর, অবস্থা বেগতিক দেখে ভর্তি করা হয় রাজধানীর এক বেসরকারি হাসপাতালে।

সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন, পেটের ভেতর অপারেশনের সময় ফেলে রাখা হয়েছে রক্ত মোছার জন্য ব্যবহৃত ১৮ ইঞ্চি লম্বা ‘মব’ কাপড়। ৩ জুলাই গভীর রাতে দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচার করে ওই কাপড় অপসারণ করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ.এইচ.এম. শাখাওয়াত হোসেন।

চিকিৎসা গাফিলতির দায় স্বীকার না করে, উল্টো হাসপাতাল চেয়েছে সমঝোতা!

নরসিংদী সিটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রতন মিয়া বলেন,

“দেড় লাখ টাকার প্রস্তাব দিয়েছি, তারা বেশি টাকা চাচ্ছেন। ভুল হয়েছে, সেটা তো আর ফেরানো যাবে না।”

এ বক্তব্যে ক্ষোভে ফেটে পড়ে ভুক্তভোগী পরিবার।

লিমার বড় ভাই জহিরুল ইসলাম বলেন—

“একটা মানুষের পেটে কাপড় রেখে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে এখন টাকার কথা! এটাই কি চিকিৎসা? এটাই কি মানবতা? এটা চিকিৎসা নয়, এটা হত্যাচেষ্টা।”

তিনি আরও জানান, নরসিংদীর সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন তারা। প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিএমডিসি ও আদালতে মামলা দায়েরের।

এ ঘটনায় নরসিংদীর সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মো. আমিরুল হক শামীম গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন—

“ঘটনাটি শোনার পরই তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। এটা নিছক ভুল নয়—রীতিমতো জঘন্য অপরাধ। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

দ্বিতীয় অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে মিলিয়ে পাঁচদিন লিমাকে রাখতে হয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (ICU)। বর্তমানে তিনি চরম সংক্রমণে ভুগছেন। আর মায়ের সেবা ও দুধ থেকে বঞ্চিত সদ্যজাত শিশুটি পড়েছে অপুষ্টির ঝুঁকিতে।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট—চিকিৎসা গাফিলতির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে, এমন ঘটনা আরও ঘটবে। ভুল বলে দায় এড়ানো যাবে না।

একজন নারী সেবা নিতে গিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে—এ দায় কার? এই প্রশ্ন রাষ্ট্র, চিকিৎসক সমাজ এবং বিচারব্যবস্থার সামনে ছুঁড়ে দিচ্ছে যমুনা সংবাদ।

যারা চিকিৎসার নামে এমন অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, কিংবা স্বজনদের হারিয়েছেন চিকিৎসা গাফিলতিতে—আপনারাও মুখ খুলুন। অন্যথায় এই নীরবতা আরও প্রাণ কেড়ে নেবে।