Home বাংলাদেশ প্রাথমিকের ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ

প্রাথমিকের ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশ

112
0
blank

নিজস্ব প্রতিবেদক:

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রধান শিক্ষক শূন্য পদে দ্রুততম সময়ে নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। দেশের ৩২ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই—এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে তিনি বলেন, “শিক্ষা ব্যবস্থায় নেতৃত্বহীনতা দীর্ঘস্থায়ী হলে শিশুদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে।”

সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা এই নির্দেশ দেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার, সচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা, প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়াসহ মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা-কর্মকর্তাবৃন্দ।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন,

“শুধু অবকাঠামো তৈরি করে প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়বে না। একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল প্রধান শিক্ষকই পারে একটি স্কুলের পরিবেশ বদলে দিতে।”

বৈঠকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের অগ্রাধিকার এবং তরুণদের নেতৃত্বে আনার সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন—

“যারা বহু বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন, তারা অবশ্যই অগ্রাধিকার পাবেন। তবে শুধু অভিজ্ঞতা নয়, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও দায়বদ্ধতাও বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি তরুণ শিক্ষকদেরও সুযোগ দিতে হবে।”

নিয়োগে স্বচ্ছতা ও সময়ক্ষেপণ রোধে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন তিনি।

সভায় উপদেষ্টা ড. বিধান রঞ্জন রায় জানান,

“আমরা দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মান মূল্যায়ন করছি। যেসব বিদ্যালয়ের ফলাফল ও পরিবেশ ভালো, সেখানে প্রধান শিক্ষকের দক্ষতা ও সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক বড় ভূমিকা রাখছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পিছিয়ে পড়া বিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হচ্ছে।”

মূল্যায়নের ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং করে তাদের উন্নয়নে বিশেষ বাজেট ও মনিটরিং জোরদার করা হবে বলেও সভায় আলোচনা হয়।

শিক্ষক বদলির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের তদবির-নির্ভর সংস্কৃতি ও জটিলতা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন—

“এক উপজেলায় চাকরি নিয়ে পরে শহরের স্কুলে বদলির জন্য সুপারিশ ও প্রভাব খাটানো এখন সাধারণ চর্চা হয়ে গেছে। এটা বন্ধ করতে হবে। বদলি হবে নীতিমালার মাধ্যমে, নিয়মের বাইরে কিছু নয়।”

তিনি একটি সুস্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক বদলি নীতিমালা তৈরি করতে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন, যাতে কোনো শিক্ষকই নিয়মভঙ্গ করে স্থানান্তরের সুযোগ না পান।

স্কুল অবকাঠামো নারীবান্ধব কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন—

“স্কুলের ভবন নির্মাণের সময় কমিটিতে অন্তত একজন নারী স্থপতিকে রাখতে হবে। নারী ও কন্যাশিশুদের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে স্কুল গঠন করতে হবে। মেয়ে শিশুরা যেন নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে বিদ্যালয়ে যেতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, মেয়েদের বিদ্যালয়মুখী করতে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, পর্যাপ্ত পানি, আলাদা হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, এবং জরুরি প্রয়োজনে আলাদা কক্ষ থাকা জরুরি।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা গড়ে তোলার অংশ হিসেবে দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে পর্যায়ক্রমে ইন্টারনেট সংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষে রূপান্তরের ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা।

তিনি বলেন—

“শিক্ষা এখন শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়ানো যায়। প্রতিটি বিদ্যালয়েই প্রযুক্তির ছোঁয়া পৌঁছাতে হবে।”

সরকারি হিসাবে দেশে ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য। ফলে একাধিক বিদ্যালয় একক প্রধানের অধীনে চলছে, কিংবা সহকারী শিক্ষক দায়িত্ব পালন করছেন, যা প্রশাসনিক জটিলতা ও নেতৃত্বের দুর্বলতা তৈরি করছে।

অভিভাবকরা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও মানের উন্নয়ন না হলে বেসরকারি স্কুলমুখী প্রবণতা বাড়বে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়াবে।

শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, প্রধান শিক্ষক পদে যোগ্যদের দ্রুত নিয়োগ, বদলি নীতিমালা সংস্কার এবং নারীবান্ধব অবকাঠামো গঠন—এই তিনটি সিদ্ধান্ত প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি দীর্ঘপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হাফিজা পারভীন বলেন,

“একজন দক্ষ প্রধান শিক্ষক স্কুলে শৃঙ্খলা, শিক্ষার মান ও শিশুদের আচরণ গঠনে বিশাল ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘদিন ধরে এই পদ শূন্য থাকায় একটি প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

প্রধান উপদেষ্টার এই নির্দেশনা প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সাহসী প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন কত দ্রুত এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে এবং একবিংশ শতাব্দীর চাহিদা অনুযায়ী দেশের প্রাথমিক শিক্ষাকে গড়ে তোলে।