Home বাংলাদেশ মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা

331
0
blank

নিউজ ডেস্ক:

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচিত হলো। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এবার আসামির কাঠগড়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছে এবং জারি করেছে গ্রেফতারি পরোয়ানা।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে ঘটে যাওয়া বৈষম্য বিরোধী ‘ছাত্র-জনতা বিপ্লব’–এ নির্বিচারে হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার অন্য দুই আসামি হচ্ছেন—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। মামলার তিন অভিযুক্তের মধ্যে একমাত্র গ্রেফতার আছেন সাবেক আইজিপি মামুন।

রোববার (১ জুন) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাটির অভিযোগ আমলে নেওয়ার শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভি সরাসরি সম্প্রচার করে ঐতিহাসিক এই মুহূর্ত। অভিযোগ আমলে নেওয়ার মাধ্যমে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এই প্রথম কোনো মামলায় বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলো। ironical হলেও সত্য, এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন নিজেই শেখ হাসিনার সরকার, ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য।

ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র ১৩৫ পৃষ্ঠার হলেও, প্রমাণসহ সম্পূর্ণ দলিলপত্র ৮ হাজার ৭৪৭ পৃষ্ঠায় বিস্তৃত। সেখানে উল্লেখ রয়েছে ভিডিও ও অডিও কল, সাক্ষাৎকার, নথিপত্র, আলোকচিত্রসহ নানা ধরনের তথ্য-উপাত্ত। সাক্ষী রাখা হয়েছে ৮১ জনকে।

চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, “শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে এবং প্রশাসনিক প্রশ্রয়ে ওই সময় এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনগুলো মিলিতভাবে এই গণহত্যায় অংশ নেয়।”

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই- আগষ্ট মাসে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমন করতে সরকার পদ্ধতিগত সহিংসতা চালায়। এই আন্দোলন পরে গণ বিপ্লবে পরিণত হয়। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মজীবি এবং সাধারণ মানুষকে হত্যা, গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

শুধু রাজনৈতিক অনুমোদন নয়, শেখ হাসিনা প্রত্যক্ষভাবে এসব হামলা ও হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এই দমননীতির কৌশল নির্ধারণ করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

এছাড়াও অভিযুক্তদের মধ্যে আসাদুজ্জামান খান কামালকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান সমন্বয়কারী এবং চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে সরাসরি অভিযান তত্ত্বাবধানকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, “পাঁচটি নির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে রয়েছে— গণহত্যার নির্দেশ, প্ররোচনা, উসকানি, গুম ও অমানবিক নির্যাতনের নীতিগত অনুমোদন এবং এসব অপরাধে সহযোগিতা।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্রের বিশ্লেষণ করে মামলাটি গ্রহণ করে এবং বলেন, “এই মামলার গুরুত্ব ঐতিহাসিক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা জনগণের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে, তাদের বিচারও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হওয়া উচিত।”

প্রসিকিউশন দলের প্রধান তাজুল ইসলাম বলেন, “এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি প্রতিজ্ঞা। আমরা চাই না— আর কখনও এ দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হোক।”

তিনি আরও জানান, এই মামলার বিচার হবে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী। সব পক্ষকে শুনানির সুযোগ দেওয়া হবে, এবং যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এই বিচার চলবে।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে ছাত্র-জনতা। আন্দোলনটি দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি দমননীতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর জনমত তৈরি হয়।

সরকার এই আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় ক্যাডারদের ব্যবহার করে ব্যাপকভাবে সহিংসতা চালায়। শহর থেকে গ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাদ্রাসা— কোথাও বাদ যায়নি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে পরিকল্পিত গণহত্যা পরিচালনা করেন।

শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান এখনও পলায়নরত রয়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তাদের সন্ধান করে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছেন।

অন্যদিকে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বর্তমানে জেলে আছেন। তাকে বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে এবং বিচারকার্য শুরু হয়েছে।

এই মামলার বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ একে সুবিচারের পথে অগ্রগতি বলছেন, কেউ বলছেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচারের পক্ষে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

এই মামলার পরিণতি শুধু একজন নেতার বিচার নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা বহন করে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার জন্য প্রতিষ্ঠিত যে ট্রাইব্যুনাল, আজ তার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন সেই ট্রাইব্যুনালের প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং। ইতিহাস যেন নিজের গতিতে, নিজের নিয়মে প্রতিশোধ নিচ্ছে না— দিচ্ছে বিচার।