নিজস্ব প্রতিবেদক:
জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে যেভাবে সেনাবাহিনী এগিয়ে এসেছে, তা জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্বশীল আচরণ জনমনে আস্থা তৈরি করেছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান—যিনি দৃঢ় নেতৃত্ব, মানবিক দূরদৃষ্টি ও কূটনৈতিক ভারসাম্য দিয়ে সেনাবাহিনীকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বলেন, “বাংলাদেশ আজ শুধু শান্তিরক্ষী নয়, বিশ্বশান্তির এক নির্ভরযোগ্য অগ্রসেনানী।” তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে শহীদ হওয়া ১৬৮ জন বীর সেনা ও পুলিশ সদস্যের আত্মত্যাগ স্মরণ করে বলেন, “তাদের ত্যাগ জাতির গৌরব, যা আমরা চিরকাল শ্রদ্ধায় ধারণ করব।”
বাংলাদেশ ১৯৮৮ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে দেশের হাজার হাজার সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্য এবং পুলিশ কর্মকর্তা যুদ্ধবিধ্বস্ত বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে বিশ্বের ৯টি দেশে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সেনাবাহিনীর ৪৮৮০ জন, নৌবাহিনীর ৩৪৩ জন, বিমানবাহিনীর ৩৯৬ জন এবং পুলিশের ১৯৯ জন—সব মিলিয়ে মোট ৫১৮০ জন।
সেনাপ্রধান বলেন, “শান্তিরক্ষীরা শুধু দায়িত্ব পালন করছেন না, তারা স্থানীয় জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে মানবিক সহায়তাও দিচ্ছেন, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমকে আরও অর্থবহ করে তুলছে।”
সম্প্রতি কঙ্গোতে বাংলাদেশের একটি হেলিকপ্টার কন্টিনজেন্ট মোতায়েন করা হয়েছে, যা ওই অঞ্চলে জাতিসংঘের মিশনের সক্ষমতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ক্যারিবীয় অঞ্চলের একটি দেশের সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশে তৈরি বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী যান উপহার দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি নির্দেশ করে না, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার এক দৃষ্টান্তও হয়ে উঠেছে।
এছাড়া সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকে বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা স্থানীয় জনগণকে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্যোগ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মানবিক ও উন্নয়নমুখী ভাবমূর্তিকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তার বক্তব্যে বিশেষভাবে তুলে ধরেন সেনাবাহিনীর মানবিক ভূমিকাকে। তিনি বলেন, “আমাদের শান্তিরক্ষীরা অস্ত্র বহন করলেও তারা কেবল যুদ্ধের জন্য নয়, শান্তি ও মানবতার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। এক একজন শান্তিরক্ষী আমাদের দেশের দূত হয়ে বিশ্বের সামনে দাঁড়াচ্ছেন।”
শান্তিরক্ষী বাহিনীগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সদস্যরা তাদের পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও মানবিক আচরণের জন্য সুনাম অর্জন করেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুদের চিকিৎসা, নারী নির্যাতন রোধে সহায়তা, শিক্ষাকেন্দ্র নির্মাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মতো কাজগুলো বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের একটি ভিন্নমাত্রায় তুলে ধরেছে।
আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘ প্রতিনিধি, কূটনীতিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য এবং সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানে এক মনোজ্ঞ “পিসকিপার্স রান” আয়োজন করা হয়, যেখানে শান্তিরক্ষীরা অংশগ্রহণ করেন। এটি ছিল শান্তির জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতীকী উপস্থাপন।
অনুষ্ঠানের বিশেষ একটি পর্বে শহীদ শান্তিরক্ষীদের পরিবারদের সম্মাননা দেওয়া হয়, যা মুহূর্তে আবেগঘন হয়ে ওঠে। সেনাপ্রধান নিজ হাতে পরিবারের সদস্যদের ক্রেস্ট ও স্মারক উপহার দেন।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী যেমন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করছে। তার নেতৃত্বে শান্তিরক্ষীরা আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত, সুশৃঙ্খল এবং আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, “সেনাবাহিনী কেবল জাতীয় সীমান্তের রক্ষক নয়, আমরা বিশ্ব মানবতার সেবক হিসেবেও দায়িত্বশীল থাকতে চাই।”
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অগ্রযাত্রা একটি সময়োপযোগী বার্তা বহন করে—যেখানে নিরাপত্তা, দায়িত্বশীলতা, মানবিকতা এবং আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ এক সুতোয় গাঁথা।
বিশ্ব যখন ক্রমাগত সংঘাত, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও মানবিক বিপর্যয়ে আক্রান্ত, তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরক্ষী ভূমিকা একটি আশার আলো হয়ে উঠেছে।
এগিয়ে চলা সেনাবাহিনীর পেছনে রয়েছে একটি প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, রয়েছে প্রতিটি সদস্যের নিঃস্বার্থ কর্মনিষ্ঠা এবং রয়েছে জাতির ভালোবাসা।
বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ববাসীর এই আস্থা—সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, ত্যাগ ও অসাধারণ মানবিক দায়িত্ববোধেরই প্রতিফলন।








